কোমরের ব্যথার ওষুধ নিতে পাগারিয়া নদী পেরিয়ে লাঠিতে ভর করে কাঁঠাল বাজার কমিউনিটি ক্লিনিকে এসেছিলেন ৬৫ বছর বয়সী নূরজাহান বেগম। বৃষ্টিতে ক্লিনিকে যাওয়ার রাস্তা কাদা ও হাঁটুপানিতে ডুবে থাকায় কষ্ট করে সেখানে পৌঁছান তিনি। তবে শেষ পর্যন্ত ওষুধ না পেয়ে হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরতে হয় তাঁকে। নূরজাহান বেগম বলেন, ‘কোমরের ব্যথা নিয়ে নদী পার হয়ে আসতে খুব কষ্ট হয়। ভেবেছিলাম, ওষুধ খেলে ব্যথা কমবে। ওষুধের আশায় এসেছিলাম, কিন্তু কোনো ওষুধ পেলাম না।’
ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলায় প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম ভরসা ৪৮টি কমিউনিটি ক্লিনিক। এসব কেন্দ্রে প্রাথমিক চিকিৎসা, মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার পরিকল্পনা, টিকাদান, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যপরামর্শ দেওয়ার কথা। কিন্তু দীর্ঘদিনের সংস্কারহীনতা, ওষুধের ঘাটতি, জনবলসংকট এবং যোগাযোগব্যবস্থার দুরবস্থায় উপজেলার বেশ কয়েকটি কমিউনিটি ক্লিনিকে কাঙ্ক্ষিত সেবা ব্যাহত হচ্ছে। সম্প্রতি উপজেলার কয়েকটি কমিউনিটি ক্লিনিক ঘুরে দেখা যায়, কোনো ভবনের পলেস্তারা খসে পড়ছে, কোথাও ছাদে ফাটল। অনেক ক্লিনিকের দরজা-জানালা ভাঙা। কোথাও ফ্যান থাকলেও তা ব্যবহারের উপযোগী নয়। কোনো কোনো কেন্দ্রে বিশুদ্ধ পানি ও ব্যবহারযোগ্য শৌচাগারের সংকট রয়েছে। রোগীদের বসার জন্য পর্যাপ্ত চেয়ার-টেবিলও নেই অনেক ক্লিনিকে।
কানিহারী ইউনিয়নের বালিদিয়া কমিউনিটি ক্লিনিক ও কুষ্টিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকে পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের মধ্যেই রোগীদের সেবা দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মীরা জানান, বৃষ্টির সময় ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। কুষ্টিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকের ছাদের একটি অংশ ভেঙে পড়ে আছে। রোগী দেখার কক্ষে ফ্যান নেই। দরজা-জানালাও নষ্ট হয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে ছাদ থেকে পলেস্তারা খসে পড়ে। এ ছাড়া সাপের উপদ্রব নিয়েও তাঁদের উদ্বেগ রয়েছে। বালিদিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকের কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) হাসিনা খাতুন এবং কুষ্টিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি তানিমা সুলতানা বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের মধ্যেই তাঁদের রোগীদের সেবা দিতে হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ত্রিশাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রত্যন্ত এলাকার অনেক মানুষের বাড়ি থেকে দূরে। ফলে কাছের কমিউনিটি ক্লিনিকই তাঁদের জন্য প্রাথমিক চিকিৎসার সহজলভ্য কেন্দ্র। কিন্তু ক্লিনিকের অবকাঠামোগত সমস্যা ও প্রয়োজনীয় ওষুধের ঘাটতির কারণে সেবা নিতে এসে অনেক সময় হতাশ হতে হয়। মাসের শেষদিকে ওষুধের সংকট কাঁঠাল, কানিহারী, রামপুর ও ত্রিশাল ইউনিয়নের বিভিন্ন কমিউনিটি ক্লিনিকে তুলনামূলক বেশি মানুষ সেবা নিতে আসেন। কাঁঠাল বাজার কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি সেলিনা আফরোজ বলেন, তাঁদের ক্লিনিকে ২০ ধরনের ওষুধ সরবরাহ করা হয়। নিয়মিত গর্ভবতী নারীরাও সেবা নিতে আসেন। গত মাসে ৩১ জন গর্ভবতী নারীকে সেবা দেওয়া হয়েছে। সেলিনা আফরোজ বলেন, ‘রাস্তা খারাপ হওয়ায় বৃষ্টির সময় রোগীদের ক্লিনিকে আসতে সমস্যা হয়। একই কারণে ওষুধ পরিবহনেও সমস্যা রয়েছে। একসঙ্গে কার্টনভর্তি ওষুধ আনা সম্ভব হয় না। কার্টন খুলে ভাগ করে ওষুধ আনতে হয়। রোগীর তুলনায় সরবরাহ কম হওয়ায় মাসের শেষদিকে ওষুধের সংকট দেখা দেয়।’
ওষুধের পাশাপাশি জনবলসংকটও রয়েছে কয়েকটি কমিউনিটি ক্লিনিকে। কাঁঠাল বাজার কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি সেলিনা আফরোজ জানান, তিনজন কর্মী থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে তিনি একাই দায়িত্ব পালন করছেন। স্বাস্থ্য সহকারীর পদটিও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, একজন স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর অতিরিক্ত দায়িত্ব থাকায় রোগীর চাপ সামলাতে সমস্যা হয়। এতে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্যপরামর্শ ও অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনাও কঠিন হয়ে পড়ে।
ত্রিশাল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা জিয়াউল বারী বলেন, কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে ট্রাস্টের মাধ্যমে ওষুধ সরবরাহ করা হয়। এক কার্টন ওষুধ শেষ হয়ে যাওয়ার পর নতুন সরবরাহ না আসা পর্যন্ত সাময়িক সংকট দেখা দিতে পারে। এসব কেন্দ্রে মূলত প্রাথমিক চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যপরামর্শ দেওয়া হয়। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘৪৮টি কমিউনিটি ক্লিনিকের মধ্যে প্রায় ৩০ থেকে ৩২টি ভবন বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এসব ভবন ভেঙে নতুন করে নির্মাণের জন্য মন্ত্রণালয়ে চাহিদা পাঠানো হয়েছে।’ সংস্কারের জন্য স্বাস্থ্য বিভাগে সরাসরি বরাদ্দ আসে না জানিয়ে তিনি বলেন, প্রকৌশল বিভাগ সরকারি বরাদ্দ পাওয়ার পর সংস্কার বা নির্মাণকাজ করে। এ বিষয়ে চার থেকে পাঁচবার প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।
বর্ষাকালে ত্রিশালের প্রত্যন্ত এলাকার যোগাযোগব্যবস্থার দুরবস্থা কমিউনিটি ক্লিনিকের সেবাগ্রহীতাদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দেয়। কাদা, পানি ও নষ্ট সড়কের কারণে অনেক রোগী ক্লিনিকে যেতে পারেন না। একই কারণে দুর্গম এলাকার ক্লিনিকগুলোতে ওষুধ পৌঁছাতেও সমস্যা হয় বলে জানান স্বাস্থ্যকর্মীরা।
ক্লিনিকে সেবা নিতে আসা রুমা আক্তার, নূরজাহান বেগম, রমিসা খাতুন, মার্জিয়া সুলতানা, রওশনারা ও স্বপ্না আক্তারের অভিযোগ, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স দূরে হওয়ায় তাঁরা বাধ্য হয়ে কমিউনিটি ক্লিনিকে আসেন। কিন্তু প্রয়োজনের সময় সব ধরনের ওষুধ পাওয়া যায় না। আবার অনেক ক্লিনিকের ভবন এতটাই পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ যে সেখানে অবস্থান করতেও ভয় লাগে। তাঁদের দাবি, পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো দ্রুত সংস্কার বা পুনর্নির্মাণ করতে হবে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ওষুধ ও জনবল নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানি, ব্যবহারযোগ্য শৌচাগার ও রোগীদের বসার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রত্যন্ত এলাকার সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থারও উন্নয়ন প্রয়োজন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, কমিউনিটি ক্লিনিক তাঁদের কাছে শুধু একটি চিকিৎসাকেন্দ্র নয়, বরং সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সবচেয়ে কাছের প্রতিষ্ঠান। এসব ক্লিনিকের ভবন ঝুঁকিপূর্ণ থাকা, প্রয়োজনীয় ওষুধের ঘাটতি এবং জনবলসংকট চলতে থাকলে প্রত্যন্ত মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার সরকারি উদ্যোগ ব্যাহত হবে। এ অবস্থায় ত্রিশালের ঝুঁকিপূর্ণ কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো দ্রুত সংস্কার বা পুনর্নির্মাণ, পর্যাপ্ত ওষুধ ও জনবল নিশ্চিত এবং বর্ষাকালে ক্লিনিকগুলোতে যাতায়াতের উপযোগী যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।











