নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাসেবার মান নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতাল চত্বরের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, সেপটিক ট্যাংক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার বেহাল দশা, জরুরি বিভাগে চিকিৎসকের অনুপস্থিতি, চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট, প্রসূতি সেবা ব্যাহত হওয়া এবং রোগীদের বিভিন্নভাবে হয়রানির অভিযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
হাসপাতাল চত্বরের সামগ্রিক পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন নাগরিকরা। সেপটিক ট্যাংক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিয়মিত পরিষ্কার না করায় ময়লা-আবর্জনা জমে থাকে। লতাপাতা, ঝোপঝাড় ও মাকড়সার জালে এসব স্থান মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আসা রোগী ও স্বজনদের ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়ার মতো রোগের ঝুঁকিতেও পড়তে হচ্ছে।
হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ সুযোগ-সুবিধার অবস্থাও সন্তোষজনক নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে আসা ডায়াবেটিস রোগী, বয়স্ক ব্যক্তি ও শিশুরা অনেক সময় চরম দুর্ভোগে পড়েন। হাসপাতালের শৌচাগারগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে থাকায় সাধারণ রোগীদের চিকিৎসকদের অফিসের বাথরুম ব্যবহার করতে বাধ্য হওয়ার মতো বিব্রতকর পরিস্থিতিরও সৃষ্টি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
হাসপাতালের ভেতরে ও আশপাশের বিভিন্ন অলিগলিতে চোর ও পকেটমারদের দৌরাত্ম্য নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। চিকিৎসা নিতে আসা অসহায় রোগীদের মানিব্যাগ ও মূল্যবান জিনিসপত্র চুরির ঘটনা ঘটছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা গার্ডদের কার্যকর ভূমিকা না থাকায় রোগীরা আরও অরক্ষিত হয়ে পড়ছেন বলে অভিযোগ তাদের।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগ উঠেছে হাসপাতালের জরুরি বিভাগ নিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, সার্বক্ষণিক দুই থেকে তিনজন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও অনেক সময় তাদের পাওয়া যায় না। এ অবস্থায় মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট এবং কখনো ওয়ার্ড বয়দের দিয়ে জরুরি চিকিৎসাসেবা পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। সেলাই করা, ইনজেকশন দেওয়া কিংবা শ্বাসকষ্টের রোগীদের অক্সিজেন ও ওষুধ দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাসেবা অদক্ষ কর্মীদের মাধ্যমে দেওয়ার অভিযোগে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। একসময় ডেন্টাল ইউনিটে বিপুল মূল্যের যন্ত্রপাতি থাকলেও বর্তমানে আধুনিক দাঁতের চিকিৎসার সুযোগ অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ। একইভাবে আল্ট্রাসনোগ্রাম সেবাও প্রায় বন্ধ রয়েছে বলে জানা গেছে। সার্জিক্যাল চিকিৎসক থাকলেও সাধারণ রোগীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
প্রসূতি সেবার ক্ষেত্রেও সংকটের অভিযোগ রয়েছে। অতীতে হাসপাতালে সাধারণ প্রসব ও সিজারিয়ান অপারেশনের ব্যবস্থা থাকলেও বর্তমানে এসব সেবা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। গর্ভবতী নারীদের সামান্য জটিলতা দেখা দিলেই অন্যত্র, বিশেষ করে বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক অথবা ঢাকার সরকারি হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে রোগী ও স্বজনদের বাড়তি অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে।
সম্প্রতি হাসপাতাল এলাকায় স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী ও সচেতন নাগরিকদের সঙ্গে চিকিৎসকদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বাকবিতণ্ডার ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে। এতে হাসপাতালের পরিবেশ ও চিকিৎসকদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পর্কের মধ্যে আস্থার সংকট আরও স্পষ্ট হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
রোগী ভর্তির ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। খাতায়-কলমে ৩০ জন রোগী দেখানো হলেও বাস্তবে সিটে ১০ জনের মতো রোগী থাকার অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের জন্য বরাদ্দ খাবারের মান নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে।
হাসপাতালে চিকিৎসকদের উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালন নিয়েও নানা অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের তদবিরে কিছু চিকিৎসক বা তাদের পরিবারের সদস্যদের পোস্টিং হলেও তারা নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেন না—এমন অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। এর ফলে কাগজে-কলমে চিকিৎসক থাকলেও বাস্তবে প্রয়োজনের সময় চিকিৎসক পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ সুযোগে স্থানীয় বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগও রয়েছে। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা দরিদ্র ও অসহায় রোগীদের বিভিন্ন অজুহাতে ফিরিয়ে দিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যেতে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়ার অভিযোগ। সোনারগাঁও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা বা নিয়ম যথাযথভাবে মানা হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। রোগীদের কাছ থেকে কখনো ২ হাজার, কখনো ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয় বলে অভিযোগ। প্রতিবাদ করলে ১ হাজার ৫০০ টাকার নিচে ভাড়া নির্ধারণে অনীহা দেখানো হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সোনারগাঁও থেকে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে রোগী নেওয়ার ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত ভাড়া রোগীর স্বজনদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। চিকিৎসকরা যখন বুঝতে পারেন হাসপাতালে রোগীর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সম্ভব নয়, তখন পরিচিত বা নির্দিষ্ট অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে রোগী অন্যত্র পাঠানোর অভিযোগও রয়েছে। এতে অনেক পরিবারকে ধারদেনা কিংবা সহায়-সম্পত্তি বিক্রি করে চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতে হচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে লেখালেখি হলেও কার্যকর পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। অতীতে গণমাধ্যমে হাসপাতালের অনিয়মের খবর প্রকাশিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়ত এবং ওষুধসহ প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হতো বলে স্থানীয়রা মনে করেন।
সোনারগাঁওয়ের ৬ লক্ষাধিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বর্তমান পরিস্থিতির দ্রুত উন্নয়ন প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা। তাদের দাবি, হাসপাতাল চত্বরের পরিবেশ উন্নয়ন, ড্রেনেজ ও পুকুরের ভাঙন রোধ, জরুরি বিভাগে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক নিশ্চিত, ওয়ার্ড বয়দের দিয়ে চিকিৎসা বন্ধ, প্রসূতি সেবা ও সিজারিয়ান অপারেশন পুনরায় চালু, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত দায়িত্ব বণ্টন, অ্যাম্বুলেন্স ভাড়ায় স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা জোরদার এবং চিকিৎসকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সোনারগাঁওয়ের সাধারণ মানুষের জন্য কার্যকর ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
উল্লেখ্য, লেখাটিতে উত্থাপিত অভিযোগগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও যাচাইয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। লেখাটির উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা নয়; বরং সোনারগাঁওয়ের সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থাগত ত্রুটিগুলো দূর করার দাবি জানানো।
— নিসর্গ বিন্দু, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট











