প্রকৃতি এবং মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রমে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জনপদে এখন আমন চাষে এক নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে। সাধারণত আমন মৌসুমের শুরুতে পর্যাপ্ত বৃষ্টির অভাবে কৃষকদের মনে চারা রোপণ নিয়ে তীব্র শঙ্কা ও দুশ্চিন্তা কাজ করে। তবে চলতি মৌসুমে আবহাওয়া সম্পূর্ণ অনুকূলে থাকায় এবং সময়মতো পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হওয়ায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন উত্তরের কৃষকরা। বীজতলা থেকে সুস্থ সবল চারা সংগ্রহ করে পরম যত্নে সারিবদ্ধভাবে চলছে রোপণ কাজ। কৃষি বিভাগের মতে, আবহাওয়া যদি শেষ পর্যন্ত এমন অনুকূল থাকে, তবে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হওয়ার পাশাপাশি বাম্পার ফলন হবে এবং কৃষকরা আর্থিকভাবে লাভবান হবেন।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি আমন মৌসুমে রংপুরের আটটি জেলায় মোট ৬ লাখ ৬৩ হাজার ৭১৪ হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যার বিপরীতে প্রায় ২৬ লাখ ৩৩ হাজার মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। ইতোমধ্যে বেশিরভাগ কৃষিজমিতে ধানের চারা রোপণের কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। বাকি জমিগুলোতেও আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে রোপণকাজ পুরোপুরি শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সরেজমিনে বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলারের শব্দে মুখরিত ফসলের মাঠ। কৃষক-কৃষাণীরা চরম ব্যস্ত সময় পার করছেন। কেউ কোদাল দিয়ে জমির আইল ঠিক করছেন, আবার কেউ মই দিয়ে জমি সমান করছেন। কেউ ব্যস্ত বীজতলা থেকে চারা উত্তোলনে, তো কেউ আবার দলবদ্ধভাবে সারিবদ্ধভাবে জমিতে চারা রোপণ করছেন। আবার বহু কৃষক মাথায় গামছা বেঁধে চিরচেনা গ্রামীণ রূপে জমিতে সার প্রয়োগ করছেন। কৃষকের ঘাম আর কাদা-জলের মিতালীতে মুখরিত এই মাঠগুলোই অদূর ভবিষ্যতে সোনালী ধানের শীষে নয়ে উঠবে। কৃষকের মুখের এই সোনালী হাসিই তাদের স্বপ্ন ও সাফল্যের রূপায়ন ঘটাবে।
তবে এই সার্বিক আশাবাদের মাঝেও কিছু হতাশার সুর শোনা যায় প্রান্তিক কৃষকদের মুখে। তিস্তা পাড়ের কৃষক নজরুল ইসলাম জানান, তিনি দুই বিঘা জমি বর্গা নিয়ে আমন ধানের চারা রোপণ করেছেন। কিন্তু বিগত বছরগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে উৎপাদন খরচের তুলনায় ধানের ন্যায্য বাজারমূল্য না পাওয়ার আশঙ্কায় তিনি বেশ দুশ্চিন্তায় আছেন। তার মতে, হাড়ভাঙা খাটুনি ও চড়া খরচের তুলনায় ধান চাষে তেমন লাভ হয় না, বরং অনেক সময় লোকসান গুনতে হয়। তবুও বিকল্প কোনো কর্মসংস্থান না থাকায় প্রায় অর্ধশত্রু ধরে তিনি কৃষিকাজ করেই জীবিকা নির্বাহ করে চলেছেন।
অন্যদিকে রংপুর সদর এলাকার কৃষক আব্দুল বারী বেশ আশাবাদী সুরে জানান, তিনি এবার পাঁচ বিঘা জমিতে আমন চাষ করেছেন। এ বছর প্রকৃতি যথেষ্ট সহায় হওয়ায় এবং পর্যাপ্ত বৃষ্টির পানি পাওয়ায় চাষাবাদে কোনো বাড়তি ঝক্কিঝামেলা পোহাতে হয়নি। সেচ খরচ বাঁচায় উৎপাদনের ব্যয়ও এবার কিছুটা কম হয়েছে। আবহাওয়া শেষ পর্যন্ত অনুকূল থাকলে ভালো ফলন পাওয়ার ব্যাপারে তিনি শতভাগ আশাবাদী। মিঠাপুকুরের রানীপুকুর এলাকার কৃষক নাসির উদ্দিন বলেন, গত বোরো মৌসুমে ধানের ন্যায্য দাম পাওয়ায় উৎসাহিত হয়ে তিনি এবার পাঁচ বিঘা জমিতে আমন চাষ শুরু করেছেন। আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই তার সব জমিতে চারা লাগানো শেষ হয়ে যাবে।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, উত্তরাঞ্চলের কৃষকদের রোপা আমন চাষের প্রতি সবসময়ই ব্যাপক আগ্রহ ও উদ্দীপনা রয়েছে। বর্তমান আবহাওয়া সম্পূর্ণ অনুকূলে থাকায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই রোপা আমন আবাদ সম্পন্ন হবে বলে আমরা দৃঢ় আশাবাদী। তিনি আরও জানান, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও এবার বেশি জমিতে আমন চাষ হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। প্রান্তিক কৃষকদের যেকোনো প্রয়োজনে এবং সার্বিক চাষাবাদে সঠিক পরামর্শ প্রদানে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে সবসময় নিয়োজিত রয়েছেন।











